প্রায় একশ পণ্যের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাড়িয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাইকারি বাজারগুলোয় বাড়ছে ড্রাই ফ্রুটসের দাম। আমদানিনির্ভর ড্রাই ফ্রুটসের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়বে বেকারি, হোটেল-রেস্তোরাঁর তৈরি খাদ্যপণ্যে। এমনিতে রেস্তোরাঁর খাবারের ভ্যাট ৫ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। ড্রাই ফ্রুটসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে প্রস্তুত খাবারের দামে বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, দেশের সিংহভাগ ড্রাই ফ্রুটসই আমদানিনির্ভর। কিশমিশ, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, পেস্তাবাদাম, চীনাবাদাম, মিষ্টি আলু, খেজুর, আখরোটের মতো ড্রাই ফ্রুটস সরাসরি খাবারের পাশাপাশি খাদ্যপণ্য তৈরিতে বেশি ব্যবহার হয়। বিয়ে, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান-উৎসবের খাবার তৈরিতেও ড্রাই ফ্রুটসের ব্যবহার বেশি। বিশেষত বিরিয়ানি, কাচ্চি, কেক, পায়েস, বিস্কুট, মিষ্টি, ফিরনি-জাতীয় খাবারে এসব ব্যবহার হয়। মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যগুলোর উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। পাশাপাশি রেস্তোরাঁর খাবার বিক্রির ওপর ভ্যাট ৫ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশে উন্নীত করায় দাম আরো বেশি বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ভ্যাট বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক অধ্যাদেশ জারির পর শনিবার বিকাল থেকেই পাইকারিতে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। বিশেষ করে শনিবার সকাল থেকে বিকালের মধ্যে দামে বড় পার্থক্য দেখা দেয়। এর মধ্যে একদিনের ব্যবধানে কিশমিশের দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকা, কাঠবাদামের ৩৫-৪০, কাজুবাদামের ১৫-২০, পেস্তাবাদামের ১০০, খেজুরের ১৫-২০, মিষ্টি আলুর ২৫-৩০ ও চীনাবাদামের দাম ৪-৫ টাকা বেড়েছে। দাম আরো বাড়বে এমন আশঙ্কায় বাজারে ক্রয়চাপ বেড়ে যাওয়ায় আগামীতেও মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, উৎপাদন পর্যায়ে বিস্কুটেও ভ্যাট হার বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন খাদ্যপণ্য বিপণনে রেস্তোরাঁগুলোয় ভ্যাট ৫ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে রেস্তোরাঁর খাবারের দাম এমনিতে বেড়ে যায়। এখন ড্রাই ফ্রুটসের দাম বাড়ায় এতে আরো বেশি প্রভাব পড়বে।
গতকাল প্রতি কেজি কিশমিশ বিক্রি হয়েছে ৫৪০-৫৫০ টাকায়, কাঠবাদাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২১০, কাজুবাদাম ১ হাজার ৬৩০ থেকে ১ হাজার ৬৫০, পেস্তাবাদাম ২ হাজার ৭০০, মিষ্টি আলুবোখারা ৬১০-৬১৫, আখরোট ১ হাজার ২০, খেজুর মানভেদে ২৯০-৩৮০ ও চীনাবাদাম ১৩০-১৩৫ টাকায়। পাইকারি বাজারে একদিনের ব্যবধানে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের মেসার্স নাজিম অ্যান্ড ব্রাদার্সের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মো. কাউসার আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার ভ্যাট হার বাড়ানোর ঘোষণার পর পাইকারি বাজার থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। বাজারে দাম বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় অনেকেই ড্রাই ফ্রুটস ক্রয়ে ঝুঁকেছে। তবে কেউ কেউ মজুদ করে বাড়তি দাম হাঁকিয়ে বিক্রি করায় কিছুটা কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে শনিবার থেকে পাইকারি বাজারে ড্রাই ফ্রুটসের দাম বেড়ে গেছে। দেশের সিংহভাগ ড্রাই ফ্রুটস আমদানিনির্ভর হওয়ায় সরাসরি আরোপ না হলেও ভ্যাট হার বৃদ্ধির খবরে বাজার অস্থিতিশীল হয়েছে।’
ভ্যাট বাড়ানোর আগে কিছু সংশোধনী এনে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধনী) অধ্যাদেশ ২০২৫-এর খসড়া সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে ১ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। ৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির আদেশে এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশের কারণে এখন থেকে রেস্তোরাঁর খাবারের বিলের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। এতদিন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁর খাবারের বিলের ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট নেয়া হতো। এছাড়া পোশাকের আউটলেটের বিলের ভ্যাট সাড়ে ৭ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ, মিষ্টির ভ্যাট হার একই পরিমাণ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতি ও মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। গতকাল এক বিবৃতিতে ক্যাব নেতারা বলেন, আগামী মার্চের প্রথম সপ্তাহে রমজান শুরু হবে। রমজান উপলক্ষে মজুদপ্রবণতায় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। শীত মৌসুমে সবজির দাম কমলেও প্রকারভেদে চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১০-১৫ টাকা। এ সময়ে ভ্যাট-সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির ফলে ব্যবসায়ীরা আরেক দফায় পণ্যের দাম বাড়াবেন। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
জানতে চাইলে ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির সময়েও খাদ্যকেন্দ্রিক বেশকিছু পণ্যের ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। তাছাড়া রেস্তোরাঁগুলোর ওপর ভ্যাট আরোপ করায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব পড়বে। ড্রাই ফ্রুটসের মতো পণ্যের দাম এতদিন অনেকটা স্থিতিশীল থাকলেও সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ব্যয় বেড়ে সাধারণ মানুষ বড় ধরনের সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমনিতে রোজার মাসে খেজুর, কিশমিশসহ বাদামজাতীয় খাদ্যের চাহিদা বেশি থাকে। মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরির কারণে সারা দেশের সাধারণ ক্রেতার পাশাপাশি খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা কারখানাগুলো ড্রাই ফ্রুটস ক্রয় করে। রোজার দেড় মাস আগে ভ্যাট বৃদ্ধির ইস্যুকে কেন্দ্র করে পাইকারি বাজারে বাদাম ও শুকনা খাদ্যের দাম বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমদানি কিছুটা শ্লথ থাকায় দাম আরো বাড়ার শঙ্কা করছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।